নিজস্ব প্রতিবেদক:
বাঁ হাতের তালুতে কয়েকটা পোড়া কয়েন। সেগুলো দেখিয়ে ব্যবসায়ী আবুল হোসেন বলছিলেন, ‘ভাইরে এই ছিল কপালে! মঙ্গলবারও ক্যাশে ছিল ৫ লাখ ১৫ হাজার টাকা। আর দুই দোকান মিলিয়ে ৮০ লাখ টাকার মতো মালপত্র। সব পুড়ে ছাই। তিন সন্তান ও আর স্ত্রীকে কীভাবে সান্ত্বনা দেব?’
বঙ্গবাজারের ১১১৮ ও ১১১৯ নম্বর দোকানের মালিক আবুল। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নাম ‘রাখি গার্মেন্টস’। গতকাল বুধবার ধ্বংসস্তূপে নিজ দোকানের পোশাক ও ক্যাশবাক্স খুঁজছিলেন। তবে কোনো কিছুই অক্ষত নেই। শেষ পর্যন্ত বেশ কয়েকটি পোড়া কয়েন খুঁজে পান। আবুল বলেন, ‘জানতাম ক্যাশবাক্সের নগদ টাকাও পুড়ে গেছে। তার পরও বারবার মনে হচ্ছিল, টাকাটা পাব। কিন্তু পেলাম না। ব্যাংক থেকে ১৯ লাখ টাকা ঋণ করেছি। মফস্বলেও বিভিন্ন পার্টির কাছে ২৫ লাখ টাকা পাব। আগুন লাগার কথা জেনে কয়েকজন ফোন করে খবর নিয়েছেন। দয়া করে যদি তাঁরা পাওনা টাকা ফেরত দেন। তবে কার কাছে কত টাকা পাব– এমন কোনো চিহ্ন নেই।’
আবুল জানান, বঙ্গবাজারের মতো পাইকারি মার্কেটে সাধারণত ২০ রোজার মধ্যে কেনাবেচার অধিকাংশ হয়ে যায়। এর মধ্যে বাইরের পার্টি পোশাক কেনা শেষ করে। ইসলামপুর থেকে পোশাক এনে ব্যবসা করেন তিনি। সেখানে কয়েকজন দোকানি তাঁর কাছে ৩০ লাখ টাকার মতো পাবেন। হাজি তালুকদার নামে একজনই পাবেন ১৭ লাখ টাকা। এরই মধ্যে টাকা শোধ করার ব্যাপারে খোঁজ নিয়েছেন তিনি। ২৫ রোজার পর ওই টাকা শোধ করার কথা ছিল। আবুল বলেন, ‘এখন না পারব দেনা শোধ করতে, না পারব আমার পাওনা তুলতে।’
সিদ্দিকবাজারের একটি কারখানায় কিছু পোশাক রয়েছে। কয়েকজন ব্যবসায়ীর কাছে তা বিক্রি করার চেষ্টা করছি। পুরো বছরই বাকিতে পোশাক কিনে বিক্রি করি। রোজার সময় ধারদেনা সব চুকিয়ে দেওয়া হয়।’
আলমগীর হোসেন ও তাঁর স্ত্রী সাকিনা আক্তার বঙ্গবাজারে তাঁদের দোকানের সামনে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাঁদের প্রতিষ্ঠানের নাম তানহা গার্মেন্টস। সাকিনা বলেন, ১০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ব্যবসা দাঁড় করাই। এখন পথে বসার অবস্থা। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়াই কঠিন হবে।
সরকারি কর্মচারী হাসপাতালের পাশে দোকানের পুড়ে যাওয়া টাকার বাক্স হাতে দেখা যায় সাদ্দাম হোসেন নামে এক দোকানিকে। কান্নাাজড়িত কণ্ঠে সাদ্দাম জানালেন, দশ বছরের বেশি সময় ধরে বিভিন্ন দোকানে কর্মচারী হিসেবে কাজ করেছেন। গত জানুয়ারিতে জমি বিক্রি ও ধারদেনা করে নিজেই একটি দোকান দেন। কিন্তু তা এখন অতীত। দোকানে ছিল ৫০ হাজার টাকা ও ৫ লাখ টাকার পণ্য। অগ্নিকাণ্ডে অন্যান্য দোকানের মতো সাদ্দামের দোকানও পুড়ে ছাই। তাঁর বাড়ি লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ উপজেলার দরবেশপুরে।
সাদ্দাম বলেন, ‘১০ বছর যাবত অনেক কষ্ট করছি। খেয়ে না-খেয়ে টাকা জমিয়ে তিন মাস হইছে দোকান দিলাম। আজ আমি নিঃস্ব। বাড়িতে আব্বা-আম্মা অসুস্থ। আমি কোথায় যাব? কিছু জায়গা-সম্পত্তি ছিল, সেগুলো বিক্রি কইরা দোকান দিছি। প্রতিদিন আব্বা-আম্মার জন্য ওষুধ কেনা লাগে, এখন তাঁদের ওষুধ কিনে দিব কেমনে?’ সাদ্দাম আরও বলেন, সরকার যেন তাঁদের জন্য কিছু করে। সরকারের পক্ষ থেকে কিছু করা না হলে হয়তো বা আবার কোনো এক দোকানে চাকরি করে খেতে হবে।
মো. ইসমাঈল নামে এক দোকান কর্মচারী বললেন, ‘মালিক লিটন হোসেনের চারটা দোকান ছিল। প্রায় আড়াই কোটি টাকার মালপত্র ছিল। কিছুই বের করতে পারিনি। সব শেষ। দোকানের মেমো কাগজপত্র ছিল, কাকে কত টাকা বাকি দিছি, সেগুলোও নাই। প্রায় সত্তর লাখ টাকার বাকি ছিল। হিসাব ছাড়া কারে কী বলব? মালিক তো বোবা হয়ে আছেন শোকে। কী করব কিছুই বুঝতেছি না। সবকিছু দুঃস্বপ্নের মতো মনে হইতেছে।’
Leave a Reply